হাসপাতালে ছেলের বউয়ের অবস্থা শোনামাত্র আফজাল সাহেব হাসপাতালে রওয়ানা দেন। বিশ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছেও যান। গাড়ি এসে হাসপাতালের গেইটে এসে থামলে আফজাল সাহেব খেয়াল করেন ফজলুল ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনছে। তিনি সেখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন ছোটো ছেলের জন্য।
" আমি তো বাড়ি এসে শুনলাম বউমার এই অবস্থা। ফোন তো বাড়িতে রেখে বেরিয়েছিলাম। কোথায় এখন ওরা?"
" আসেন আমার সাথে। ভাবির অবস্থা ভালো না, আব্বা। মা কাল ভাবিকে দিয়ে এই গরমের সময় ওতোকিছু রান্না করিয়ে আবার হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। সে বেচারিও তো মানুষ, তারও তো শরীর আছে, রোবট তো আর না। গাড়িওয়ালা হয়তো জোরে চালিয়ে এনেছিল তাতেই এই অবস্থা। প্রেগন্যান্সির প্রথম কয়েকমাস খুব সচেতন থাকতে হয় এমনিতেই। সে বেচারিও বা কী করবে? মাও কেমন করে আবার আপনার ছোটো বউমাও তো মানুষের বাচ্চা না। ওরে আমি আর চাকরি করতেই দেব না। ভালো পুরুষ হয়ে লাভ নাই।"
আফজাল সাহেব কিছু বলেন না। কীই বা বলবেন, ছেলে তো আর ভুল বলেনি। জাহানারা বেগম যে ছোটো বউয়ের পক্ষ নিয়ে বড়ো বউমাকে দিয়ে সারা বাড়ির কাজ করায়, ভালো ব্যবহারটুকু করেন না সেটা তিনি জানেন। কতরাত তিনি স্ত্রীকে পাশে নিয়ে কত বুঝিয়েছেন কিন্তু কাজে দেয়নি। আফজাল সাহেব মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন - এর একটা বিহিত করতেই হবে।
ফরহাদ কেবিনের বাহিরে একটা চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে ছিল। বাবা আর ভাইয়ের গলা শুনে মাথা তুলে তাকায়।
চেয়ার ছেড়ে বাবাকে বসতে বলায় আফজাল সাহেব বলেন," বসব না। বউমার কী অবস্থা?"
ফরহাদ ভাঙা গলায় বলে," ওর অবস্থা ভালো না আব্বা। ডাক্তার বলেছে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখা খুব মুশকিল। র*ক্ত দেওয়া হয়েছে, চলছে। আমার বোধ হয় 'বাবা' ডাক শোনা আর হবে না আব্বা। মা ওর সাথে এত খারাপ ব্যবহার না করলেও পারতো। আমার বাড়ির মানুষের জন্যই আমার পৃথিবীতে না আসা বাচ্চাটা হয়তো বিদায় নেবে। তাতেও অর্ষারই দোষ হবে। কোনোভাবে যদি অর্ষা আর আমার বাচ্চা বেঁচে যায় তাহলে আমি আর ওকে এ বাড়িতে রাখব না আব্বা। আমার জীবনসঙ্গীকে এই আ*গুনে আর পু*ড়তে দেব না। "
কথাগুলো বলে চোখ মুছতে থাকে ফরহাদ। আফজাল সাহেব কঠোরকণ্ঠে বলেন," তোর মা ভুলে গেছে যে তার বড়ো বউমা না থাকলে তার পেটে আর ভাত যাবে না। সে ভুলে গেছে এক চোখ দিয়ে সারা দুনিয়া তৃপ্তি নিয়ে দেখা যায় না আর সে চোখে যদি বালিভর্তি থাকে তাহলে তো কোনো কথাই নেই। "
তিনটা মানুষ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাহিরে বসে, দাঁড়িয়ে, হেটে সময় কাটায়। ফজলুল সময় সুযোগ বুঝে হোটেল থেকে তিনজনের কিছু খাবার এনেছিল কারণ সে জানে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসার মানুষ নেই। তার বোন হাসপাতালে ছিল তাকে সকালে ছাড়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে। ব্যস্ততায় তাকেও জানানো হয়নি অর্ষার কথা।
খাবার নিয়ে এসেও লাভ হয়নি। আফজাল সাহেব দুবার মুখে দিলেও ফরহাদ একটু পানি পর্যন্তও খায়নি। কিছুক্ষণ পরপর অর্ষার কাছে গিয়ে পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে আর চোখের পানি ফেলেছে।
ডাক্তার আর নার্স অর্ষাকে দেখতে আসলে তিনজনই বাহিরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে ডাক্তার এসে মৃদু হেসে বলে, " পেশেন্টকে নিয়ে প্রথমে যতটা ভয় পেয়েছিলাম ততটা আর ভয় নেই, আলহামদুলিল্লাহ। তবে যতটুকু ভয় আছে ততটুকু যেন না থাকে তার জন্য অন্তত দুইদিন উনাকে এখানে রাখুন। হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হবে আর কিছু কেনা পড়বে। আর হ্যাঁ পেশেন্টকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে কমপক্ষে তিন সপ্তাহ একদম বেডরেস্টে রাখবেন। কোনো কাজ যেন না করতে হয়। আলাদা সংসার হলে আপনি নিজে রান্নাবান্না করবেন নইলে উনার মা বা কেউ যেন এসব পরিচালনা করে। কথাগুলো না মেনে চললে হিতে বিপরীত কিছু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উনার যত্ন নিবেন, আসছি।"
ডাক্তারের কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সবাই। ফরহাদের মুখে হাসি ফুটে যায়। বারান্দা দিয়ে বাহিরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে থাকে। বাবা আর ছোটো ভাইকে রেখে সে মসজিদে চলে যায় শোকরানা নামাজ আদায় করতে।
___
রাতে আফজাল সাহেব আর ফজলুল বাসায় ফিরলেও ফরহাদ স্ত্রীকে ফেলে এক মুহূর্তের জন্য অন্যকোথাও সরেনি। সকালে আর বিকেলে অর্ষার বাবা-মা এসে তাকে দেখে গিয়েছে। অর্ষার মা মেয়ের কাছে থাকবে বলে জিদ ধরলেও ফরহাদ থাকতে দেয়নি। অর্ষার মা মানুষটা খুবই অসুস্থ ছিল বিধায় ফরহাদ নিজেই জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে।
ফরহাদ আটটার দিকে একটু বাহিরে গিয়ে কিছু ফল আর পাউরুটি কিনে এনেছে অর্ষার জন্য৷ বিকেলের দিকে ঘুমিয়েছিল সে। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সাড়ে নয়টা। নার্স আটটার সময় এসে বলে গিয়েছে কিছু খাইয়ে যেন ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয় অর্ষাকে।
অর্ষার ঘুম ভাঙলে ফরহাদকে দেখে মৃদু হাসে সে। ফরহাদ মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে একটা চুমু দেয়। অর্ষার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে," এখন উঠে একটু বসতে হবে। কিছু খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।"
" বিকেলে খেয়েছিলাম তো। আমার এখন আর খেতে ইচ্ছে করছে না গো।"
" উহু ওসব আমি শুনবো না। "
ফরহাদ অর্ষাকে জোর করে তুলে বসিয়ে দেয়। ফলের মধ্যে কমলা আর আঙ্গুর অর্ষার পছন্দ। বোতল থেকে পানি নিয়ে ফলগুলো ধুয়ে নিজেই অর্ষাকে খাইয়ে দেয়। অর্ষাও মাঝে মাঝে ফরহাদকে জোর করে খাইয়ে দিতে থাকে৷
অর্ষা আশেপাশে একটু দেখে ফরহাদকে বলে," একটু কপাল এগিয়ে আনো তো, চুমু দিব। আজ সারাদিন তুমি আমার কাছেই আসোনি।"
অর্ষার কথা শুনে হেসে ফেলে ফরহাদ। নির্দ্বিধায় এগিয়ে যায় অর্ষার দিকে। অর্ষা ফরহাদের দুইগালে হাত রেখে কপালে চুমু দেয়। ফরহাদ নিজেও সুযোগকে কাজে লাগায়।
অর্ষা ফরহাদকে দেখতে থাকে আর ভাবতে থাকে এই মানুষটা আট বছরেও পরিবর্তন হয়নি। ঠিক প্রথমদিনের মতোই ভালোবেসে যাচ্ছে। কিছু মানুষের ভালোবাসা হয়তো আসলেই কমে না।
আফজাল সাহেব আর ফজলুল বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে দুজন। শায়েলা এসে খাবার বেড়ে দেয়।
আফজাল সাহেবের প্লেটে ভাত দিতেই তিনি একবার রুমের দিকে তাকিয়ে আবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে," তোমার শাশুড়ি শুয়ে কেন? খাবে না? "
শায়েলা শুকনো ঢোক গিলে বলে," আ আসলে আম্মার নাকি শরীর খারাপ লাগছিল। তাই উনি একটু শুয়েছেন।"
" খেয়েছে?"
" না। খাননি।"
" ডেকে নিয়ে এসো। খেতে বলো।"
শায়েলা ফজলুলকে খাবার বেড়ে দিয়ে শাশুড়িকে ডাকতে যায়। জাহানার বেগমের পাতলা ঘুম আবার ভেঙে যাওয়ায় হাতের জ্বলু*নিতে কুঁকড়ে ওঠেন।
শায়েলা পাশে দাঁড়িয়ে বলে," আম্মা, খাবেন চলেন।"
জাহানারা বেগম নড়েচড়ে উঠে বিছানা ছাড়েন। সোজা খাবার টেবিলে চলে যান। সবাই মিলে রাতের খাওয়া শেষ করে ঘুমাতে চলে যায়।
জাহানারা বেগম বিছানায় শুয়ে আফজাল সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলেন," বউমার কী অবস্থা? সারাদিন তো একটা কলও করোনি।"
আফজাল সাহেব কপালে হাত রেখে বলেন," যাকে পছন্দই করো না, সারাদিন কাজের মেয়ের মতো খাটিয়ে মা*রো তার অবস্থা জেনে কী করবে? যে নজরে দুজনকে দেখো তো তোমার কপালে অশেষ দুঃখ আছে। তোমার কি মনে হয় ফজলুলের বউ তোমাকে রান্না করে খাওয়াবে? সময় থাকতে ভালো হয়ে যাও।"
জাহানারা বেগম ভারী গলায় বলেন," বাড়ি এসে জানতেও চাইলে না আমি কেমন আছি?"
" কেন? তোমার খারাপ থাকার কথা নাকি?"
" বিকেলে রান্না করতে গিয়ে হাত পু*ড়িয়ে নিয়েছি।"
" তোমার আদরের বউমা একদিন রান্না করে খাওয়াতে পারলো না?"
" শায়েলা ব্যস্ত ছিল।"
" রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস করো জাহানারা, তোমার বড়ো ছেলে তার বউকে আর এ বাড়িতে রাখবে না। হয়তো সংসার আলাদা করবে নইলে বউমাকে তার বাপের বাড়ি রেখে আসবে মাস খানেকের জন্য। বউমাকে পুরো বেডরেস্টে থাকতে বলেছে ডাক্তার।"
জাহানার বেগম এক মুহূর্তে বিছানা ছেড়ে উঠে বসেন। গম্ভীরমুখে বলেন," রান্না করতে করতে ছোটোবউমাকে সবজি কা*টতে বলতে গিয়ে শুনি কাকে যেন বলছে- আমি কাউকে রান্না করে খাওয়াতে পারব না। ফজলুলের মাকেও না। বাড়িতে বসে বসে খাবে আর আমি রান্না করব সেটা হবে না।"
আফজাল সাহেব তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে," এতো জলদি চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেবে সেটা আন্দাজে ছিল না। তোমার আরও খারাপ দিন আসছে। মেয়েটার সাথে কম খারাপ ব্যবহার করোনি। তোমার বড়ো ছেলেটা অত্যন্ত ভদ্র বলে এতোদিন বেঁচে গেছো৷ তোমার জন্য আজ যে তার খুশি হারিয়ে ফেলতে লেগেছিল। আল্লাহ বাঁচিয়ে নিয়েছে।"
জাহানারা বেগম মাথা নিচু করে বলেন," আমার খুব ভুল হয়ে গেল তাই না?"
" খুব।"
" মাফ চাইলে মাফ করবে না বড়ো বউমা?"
" সেটা তার বিষয়। তার জায়গায় আমি থাকলে মাফ পেতে না। তার ব্যাপারে জানি না।"
জাহানারা বেগম অনুযোগভরা কণ্ঠে বলেন," আমার খুব ভুল হয়ে গেছে গো। আমাকে কাল একটু নিয়ে যেও৷ আমি বউমার কাছে ক্ষমা চাইবো। সে আমায় কখনো অসম্মান করেনি আমিই এতোদিন চোখে কাপড় বেঁধে ছিলাম। ছোটোবউমা চাকরি করে যেন তার পক্ষে থেকে বড়ো বউমার সাথে অন্যা*য় করেছি আমি। "
আফজাল সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। মনে মনে ভাবেন এই তিক্ত সংসারের সমাপ্তি বোধ হয় এবার হবে। মিঠা সংসারের সূচনা হয়তো খুব একটা দূরে নয়।
চলবে

0 Comments