সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে জাহানারা বেগম বায়না ধরলেন তিনি অর্ষার কাছে যাবেন। আফজাল সাহেব বললেন," সকালে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ওদের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া যাবে। বউমাকে বলো রান্না করতে।"
জাহানারা বেগম শায়েলার রুমে গিয়ে দেখলেন শায়েলা বসে বসে বোনের সাথে কথা বলছে। শাশুড়িকে দেখে কল কেটে দেয় সে। বিছানা থেকে উঠে বলে," কিছু বলবেন, আম্মা?"
" হুম৷ ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে রেখেছি, একটু রান্না করে ফেলো তো।"
" আম্মা, আমি রান্না করব?"
" রান্না না করলে খাবে কী? যাও রান্না বসাও। অনেক তো অন্যের রান্না খেলে এবার একটু নিজে রান্না করে অন্যদের খাওয়াও।"
" আমার তো স্কুলে যেতে হবে। "
জাহানারা বেগম রুম থেকে যেতে যেতে বলেন," আগে সংসার তারপর স্কুল। সংসার সাকলে যদি স্কুলে যেতে পারো তাহলে স্কুলে যাবে নইলে চাকরি ছেড়ে দাও। বেছে নাও কোনটা প্রয়োজন তোমার।"
শায়েলা পিছন থেকে বলে," এখন কি বড়ো বউয়ের সাথে যেরকম করেছেন আমার সাথেও ওরকম করবেন নাকি? আমি কিন্তু ভাবির মতো না। আপনি আমার সাথে এরকম করতে পারেন না। "
জাহানারা বেগম পিছন ফিরে তাকান৷ মৃদু হেসে বলেন," তোমার জন্যই মেয়েটার সাথে আমি খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। দুজনকে দুই নজরে দেখেছিলাম। এখন থেকে তোমরা দুজন আমার নজরে একই। বড়ো বউমাকে এক মাসের মতো রেস্ট করতে বলেছে তাই সে বাসায় আসলে তার পরিবর্তে আমি তোমাকে সাহায্য করব বাড়ির কাজে। বাড়িতে নতুন অতিথি না আসা পর্যন্ত তোমাকে আজ থেকে সব করতে হবে যদি এই সংসারকে নিজের সংসার ভাবো। তোমার মতো অনেকেই আছে যারা চাকরি করে, তারা সকাল সকাল উঠে ঘণ্টাখানেক মা-বোনের সাথে ফোনালাপ না করে সংসারের কাজ শেষ করে চাকরিতে যায়। তুমিও সেরকম অভ্যাস করো। "
জাহানারা বেগম নিজের ঘরে গিয়ে নিজের জামাকাপড় ছোটো একটা ব্যাগে নিয়ে নেন৷ মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি অর্ষার সাথে আজ থেকে হাসপাতালে থাকবেন।
আর কোনো রাস্তা না পেয়ে রান্নাঘরে যেতেই হয় তার৷ ভাত চড়িয়ে তরকারিও রান্না করতে হয়। রান্না করছে আর মনে মনে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে তার মনে৷ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে তিন বছর যাবৎ, এই তিনবছরে তাকে নিজের ঘর ঝাড়ু দেওয়া ছাড়া এই বাড়ির কোনো কাজ তার করতে হয়নি আর আজ থেকে কি না সবকাজ করতে হবে!
খাওয়া শেষ করে আফজাল সাহেব হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। শায়েলা তাড়াতাড়ি করে রুমে এসে ফজলুলকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। ফজলুল ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে বলে," কী হয়েছে? এভাবে ডেকে তুললে কেন?"
শায়েলা তেজি গলায় বলল," আমি এ বাড়িতে থাকব না।"
" বাপের বাড়ি যাবে? আচ্ছা স্কুল থেকে চলে যেও।"
শায়েলার গলা আরও সূচালো হয়। বলে, " বাপের বাড়ি কেন যাব? তোমাকে কি আমি বিয়ে করেছি বাপের বাড়ি থাকার জন্য? তুমি বাসা খুঁজো। আমরা বাসা ভাড়া থাকব। "
ফজলুল বড়োসড়ো একটা হাই তুলে বলে," নিজের বাড়ি থাকতে ভাড়া থাকতে হবে কেন? আমি কোনো ভাড়া বাসায় থাকতে পারব না। তোমার টাকা বেশি হলে তুমি নিয়ে থাকো। আমার টাকা লাফাচ্ছে না।"
" শোনো আমি এখানে এতো মানুষের রান্না করতে পারব না৷ পুরো বাড়ির কাজ আমি করতে পারব না। "
ফজলুল এতোক্ষণে সবকিছু বুঝতে পারে। তার বড়োভাবি অসুস্থ। শায়েলার এখন সব কাজ করতে হবে জন্য এরকম বলছে৷
ফজলুল দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে," তিনটা বছর যে কোনো কাজ না করে শ্বশুরবাড়িতে থাকলে, খেলে আর এখন বড়োভাবি অসুস্থ বলে তুমি নতুন বাসা নিতে চাইছো কাজের ভয়ে? বাসা ভাড়া কে দেবে তুমি? সেখানেও তো তোমাকে একাই সংসার সামলাতে হবে এখানে থাকলে তবুও সহায়তা পাবে। "
" মনে করো কাজের ভয়েই যাচ্ছি, তোমার দায়িত্ব আমাকে ভালো রাখা।"
" ওকে। আমি তোমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব নিব আল্লাহ চাইলে। তুমি চাকরি ছেড়ে দাও, সংসারের দায়িত্ব নাও। আমি সকালে অফিসে যাওয়ার আগে খাবার তৈরি করে দেবে, অফিস থেকে আসলে সেবা করবে, ভালো ভালো রান্না করে খাওয়াবে৷ আমার বাড়িতে কোনো কাজের লোক কাজ করবে না। একটা মেয়ে একাহাতে যেভাবে সংসার সামলায় তোমাকে ঠিক সেভাবেই সংসার সামলাতে হবে। "
" আমি যেভাবে পারি সংসার চালিয়ে নিতে পারলেই হলো। আমি ঘর বাহির দুটোই সামলে চলব। হেল্পিং-হ্যান্ড রাখলে তোমার কি সমস্যা?"
" তাহলে এখানেই রেখে দাও। তুমি যদি কাজ করতে না চাও তাহলে নিজের টাকায় কাজের লোক রেখে দাও। আমি আমার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না। আমার ওপর তোমার যেমন হক আছে সেরকম আমার বাবা-মা, ভাই সবার আছে। মনটা পরিষ্কার করে চলো দেখবে এ বাড়ির সবাইকে, সবকিছু ভালো লাগবে। আর হ্যাঁ তুমি তোমার মন মানসিকতা ভালো না করলে আমিও আমারটা খারাপ করতে বাধ্য হবো। তুমি আমার বাড়ির মানুষের প্রতি যেরকম মনোভাব পোষণ করো যেরকম ব্যবহার করো ঠিক সেরকমই আমি তোমাকে আর তোমার বাড়ির মানুষকে ফিরিয়ে দেব। "
শায়েলা ভ্রু কুচকে বলে," আমাকে ভয় দেখাচ্ছ তুমি?"
" ভয় না যা করব তাই বলছি। তোমার মানসিকতা দেখে এখন বুঝতে পারছি টাকা পাওয়ার পরও কেন তোমার ভাইয়ের বউ তোমাকে দেখতে পারে না। শোনো শায়েলা, আমি চাইলেই আমার ভাইয়ের বিপরীত হতে পারি। আমার ভাই তার বউয়ের সাথে বাচ্চা না হওয়া সত্ত্বেও আট বছর ধরে আছে এখন আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেছেন। আমি চাই তুমি মনটা ফ্রেশ রাখো।"
চুপ হয়ে যায় শায়েলা। মুখে তার কোনো কথা নেই। ফজলুল এবার নরমস্বরে বলে," কষ্ট করে চাকরি করে এতো ইনকাম করে কী করবে? আমরা তো কোনোদিন বাবা-মা হতে পারব না। সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে মিলেমিশে থাকো এটাই ভালো।"
___
জাহানারা বেগম আজ তিনদিন যাবৎ হাসপাতালে বড়ো ছেলের বউয়ের সাথে রয়েছেন। সেদিন রাত তার ভাবনাতেই কেটেছিল। সেই একটা দিন এবং একটা রাত উনাকে অনেককিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
বাড়ি থেকে স্বামীর সাথে হাসপাতালে এসে তিনি আর বাড়ি ফিরে যাননি। অর্ষার হাত ধরে খুব কান্নাকাটি করেছিল সেদিন। নতুন এক মানুষের যেন দেখা পেয়েছিল অর্ষা।
জাহানারা বেগম হাসপাতালে আসার পর থেকে অর্ষার সমস্ত দেখাশোনা তিনি নিজেই করেছেন। বিকেল হলে অর্ষাকে নিয়ে বারান্দার দিকে এসে চেয়ার নিয়ে বসে বাহিরের পরিবেশ দেখেছেন এবং গল্প করেছেন।
ভালো সময় হয়তো খুব তাড়াতাড়ি চলে যায়। হাসপাতালের দিনগুলো ঠিক এরকমই। অর্ষা এ কয়েকদিনে শাশুড়িকে দেখে শুধু অবাক হয়েছে।
আজ যখন অর্ষাকে নিয়ে সবাই বাড়ি ফিরছিল তখন কথায় কথায় ফরহাদ তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে," আব্বা, আমি ভেবেছি অর্ষাকে ওর বাবার বাসায় রেখে আসব কয়েকদিনের জন্য৷ ওর এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। ওর মায়ের কাছে থাকলে ও ভালো থাকবে। এখানে থাকলে ও কাজ না করে থাকবে না, জানেনই তো ডাক্তার বলেছে কোনো কাজ করা যাবে না।"
জাহানারা বেগম বলে ওঠেন," বউমা এখানেই থাকুক না। এতগুলো বছর বাড়ির সবার সেবা করল রি কয়েকটা দিন আমরা নাহয় বউমার সেবা করলাম। ভালো থাকলে এ বাড়িতে থাকবে অসুস্থ হলে আমরা কেন দেখব না? আমি সবসময় ওকে দেখে রাখব। যদি না পারি তখন না হয় রেখে আসিস।"
আফজাল সাহেব পাশে থেকে বলে ওঠেন," আমার মনে হয় জাহানারা ঠিক বলেছে। তোমার আম্মা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে দেখছোই তো। বাকিটা তোমার আর বউমার বিষয়। আমাদের কোনো বাঁধা নেই।"
ফরহাদ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে অর্ষার দিকে তাকায়। অর্ষা মৃদু হেসে বলে," আমি এখানেই থাকব। আল্লাহ ভরসা। "
অর্ষার কথায় জাহানারা বেগম মৃদু হাসেন। আফজাল সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
শায়েলা রান্নাঘরে ব্যস্ত। তিনদিন হলো সে বাসায় প্রায় একা। মাঝেমাঝে আফজাল সাহেব আর ফজলুল বাসায় এসেছে কিন্তু বেশি দেরি না করে আবার হাসপাতালে ছুটেছে। ফজলুল তিনদিন আর শায়েলার সাথে ভালোভাবে কথা বলেনি৷ দূরত্ব বজায় রেখেছে সবসময়। শায়েলা বুঝেছে বাড়িতে অশান্তি থাকলে বাহিরের কোনকিছুই শান্তি দেয় না। সে স্কুলেও ফোন দিয়ে বলে দিয়েছে একমাসের ছুটি লাগবে তার। ছুটিটা কাজে লাগাবে সে। নড়বড়ে হয়ে যাওয়া সম্পর্কটা আবার শক্ত করে জোরা লাগাবে সে।
কলিংবেল বেজে উঠতেই চুলার আঁচ কমিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে সে দরজা খুলে দেয়। বাহিরে অর্ষাকে দেখে মুখে হাসি ফোটে তার। ডান হাতটা ধরে ভেতরে নিয়ে আসতে আসতে বলে," তোমাকে খুব মিস করেছি ভাবি। বাড়িতে আমার খুব একা একা লাগছিল। এখন তোমরা এসে গেছো এখন ভালো লাগছে।"
শায়েলা নিজেই অর্ষাকে তার রুমে নিয়ে যায়। সবাই অর্ষার রুমেই চলে যায়। শায়েলা গিয়ে অর্ষার পাশে বসে হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে," আজ থেকে তোমার কোনো কাজ করতে হবে না। তুমি একদম বেডরেস্টে থাকবে। আমি স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছি। এই একমাস আমি তোমার সাথে সাথে থাকব। তোমার একটুও খারাপ লাগবে না। আর শোনো আমি তোমার খাবার তালিকা করে দেব ওভাবেই আজ থেকে খাবে। "
অর্ষা শায়েলা আর জাহানারা বেগমের পরিবর্তন দেখে ভেতরে ভেতরে স্বস্তি পাচ্ছে। মানুষগুলো তিন চারদিনে কত পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই মানুষগুলোকে সে এতোদিন যেভাবে চেয়ে এসেছে আজ যেন সেরকমই দেখছে।
বাড়ির মানুষগুলোর ব্যবহারে আজ কেমন সমস্ত দুঃখ ছুটি নিয়েছে। এতকিছু সম্ভব হয়েছে ফরহাদের জন্য। সৃষ্টিকর্তা এই মানুষটাকে পরিবর্তন করে দিলে হয়তো এই দিনটা আসতো না।
ফরহাদ কিছু একটা ইশারা করতেই অর্ষা শায়েলার দিকে তাকিয়ে বলে," দুটো মেয়ে আসছে, আমি তো একা ওদের বড়ো করতে পারব না তোকেও ওদের আরেকটা মা হতে হবে বলে দিলাম। আমি একা একা আর কোনো দায়িত্বই পালন করব না। অর্ধেক তুই আর অর্ধেক আমি।"
অর্ষার কথায় শায়েলার মুখে হাসি ফোটে। ফজলুলের দিকে তাকালে ফজলুলও তাকে মৃদু হাসি ফিরিয়ে দেয়। ঘরের সবার মুখেই যেন আনন্দের হাসি লুটোপুটি খাচ্ছে। জাহানার বেগম ছেলে-বউ সবাইকে এক হতে দেখে সানন্দে বলে ওঠেন," আজ আমার এক নতুন সংসারের সৃষ্টি হলো। পুরোনো সংসারের কোনো চিহ্ন নেই এতে। "
(সমাপ্ত)

0 Comments