বিছানায় রক্তের লাল ছোপ ছোপ দাগ দেখে আঁতকে ওঠে অর্ষা। মাত্রই সে ফজরের ওয়াক্তে নামাজের জন্য ঘুম থেকে উঠেছিল। বিছানা ছেড়ে উঠে রুমে লাইট জ্বা*লাতেই বিছানায় চোখ যায় তার। বেডশীটের জমিন সাদা রঙের হওয়ার র*ক্তের দাগ স্পষ্ট। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে তার। পা যেন তার নিজের শরীরের ভার নিতে পারছে না। এরকম অন্যা*য় কী করে হলো তার সাথে! চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে এসে বিছানার একপাশে বসে সে। ফরহাদকে ভাঙা গলায় ডাকতে থাকে।
সে প্রথমে অর্ষার চোখের পানি খেয়াল করেনি। খেয়াল করতেই তড়িৎ গতিতে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। বড়ো উৎকন্ঠায় জানতে চায়," কী হয়েছে? কান্না করছ কেন?"
অর্ষা তখনও কান্না করে যাচ্ছে। ছোটো বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে কান্না করলেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে সে। কান্নাজড়ানো গলায় বলে," আমার বাচ্চা হয়তো আর নেই ফরহাদ। ও বোধ হয় আমাকে আবার আ*গুণ যন্ত্রণায় ফেলে চলে গেল।"
ফরহাজ অর্ষার কথা শোনামাত্র তার দিকে এগিয়ে আসে। হাত ধরে বলে," কী বলছো তুমি! "
" হ্যাঁ ফরহাদ। বিছানা দেখো।"
ফরহাদ বিছানায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। দুই তিন জায়গায় র*ক্তের দাগ। হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে সে। মন শান্ত করে অর্ষার মাথাটা নিজের বুকে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে থাকে," আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো অর্ষা, তিনি আমাদের প্রতি কঠিন হবেন না। আল্লাহ আমাদের দিক থেকে মুখ সরিয়েও নিবেন না। আল্লাহ আমাদের সবার৷ তুমি কেঁদো না তো। তুমি এখানে বোসো, আমি বাড়িতেই আজ নামাজটা পড়ে নিই। তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। "
অর্ষা কান্না করতে করতে বলে," কোথাও যাব না আমি। আল্লাহ আমার বাচ্চাকে নিয়ে গেল আমি নিয়ে গেলে কী হয়? আমি যে আর সহ্য করতে পারি না।"
ফরহাদ মিথ্যে চোখ রাঙিয়ে বলে," উহ, এরকম কথা যেন আর না শুনি। আমি তোমার জন্য দোয়া করে দেব৷ এখন এখানে বসো। "
ফরহাদ ওজু করে এসে নামাজটা পড়ে নেয়। জায়নামাজে বসেই হাত বাড়িয়ে অর্ষাকে নিজের কাছে ডাকে। অর্ষা ফরহাদের কাছে গিয়ে বসে। দুজন অনেকক্ষণ সেখানে সময় পার করে। হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দ হতেই অর্ষার মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বসা থেকে উঠতে গেলে ফরহাদ তাকে থামিয়ে দেয়।
মৃদু হেসে বলে," তুমি বসে থাকো। আমি দেখছি।"
দরজা খুলে মা জাহানারা বেগমকে দেখে সালাম দেয় ফরহাদ। জাহানার বেগম সালামের জবাব দিয়ে মুখ কালো করে ফেলে। বলে," তোর বউয়ের ঘুম ভাঙেনি আজ? সে এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমোলে এ বাড়ির কারো গলা দিয়ে ভাত নামবে না সেটা তোর বউ জানে না? রিনির আজ সাড়ে আটটায় স্কুলে যেতে হবে, বলল৷ ওর তো টিফিন নিয়ে যেতে হবে, খেয়ে যেতে হবে। রাজরানীকে বল তাড়াতাড়ি ভাত চড়াতে।"
ফরহাদ মলিনমুখে বলে," মা, ও একটু অসুস্থ। আজ রিনিকে একটু বলো যেন রান্নাটা আজকের জন্য করে নেয়।"
জাহানারা বেগম যেনে আ*গুনে রাখা লোহার মতো তেতে ওঠেন। জোরগলায় বলেন," মগের মুল্লুক নাকি? স্কুলে পড়াতে যাবে আবার রান্না করে নিয়ে যেতে হবে? সর দেখি তোর বউয়ের কী অসুখ হলো।"
জাহানারা বেগম ছেলেকে ঠেলে পাশে সরিয়ে রুমের ভেতরে চলে আসে। অর্ষাকে মেঝেতে বসে থাকতে দেখে বলে ওঠেন," কী সমস্যা তোমার? দিব্যি তো বসে রয়েছ আর আমার ছেলেকে দিয়ে বলিয়েছ যে তুমি অসুস্থ? এত কামচোর কেন গো? যাও ওঠো, রান্না চাপিয়ে দাও।"
পিছন থেকে ফরহাদ বলে ওঠে," আম্মা, আজ অর্ষা কিছুতেই রান্নাঘরে যাবে না। তুমি প্লিজ অন্যকাউকে বলো রান্না করতে।"
জাহানারা বেগম এবার চিৎকার করে উঠে বলেন," বউ তোরে বশ করছে? সবসময় বউয়ের হয়ে কথা বলিস কেন?"
" আম্মা, অর্ষা নামাজের জন্য উঠে দেখে বিছানায় র*ক্তের দাগ। সন্দেহ হচ্ছে বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে কি না। গতকাল তো আপার জন্য খাবার নিয়ে ওকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলে তুমি।"
বিছানার দিকে তাকায় জাহানারা বেগম। ক্ষোভ নিয়ে বলেন," বাচ্চাটা শেষ করে ফেলল তোর বউ আর দোষ দিচ্ছিস আমার? দশটা মিনিট লাগে হেটে যেতে, তোর বউ গাড়িতে না পেলেই পারতো। আর গাড়িতে গিয়েই যে বাচ্চা নষ্ট হইছে সেটা তুই জানলি কী করে? এতদিন পর একটা বাচ্চা পেটে আসলো সেটাও নষ্ট করে ফেলল এই মেয়ে। সন্তানসুখ তোর বউয়ের কপালে নাই। হায় আল্লাহ গো কী হয়ে গেল এটা...."
জাহানারা বেগম কপাল চাপড়ে বিলাপ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সাথে সাথে বাড়ির শান্ত পরিবেশ অশান্ত হলো। ফরহাদ অর্ষাকে তৈরি হতে বলল। ফরহাদের কথামতো অর্ষা মিনিট দশেকের মধ্যে তৈরি হয়ে নিলো।
রুম থেকে বের হতেই ফরহাদের ছোটো ভাই ফজলুল এগিয়ে এলো। ভাইয়ের কাধে হাত রেখে বলল," ভাই, ভাবিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে যা। তোর বন্ধু আছে না এই হাসপাতালে? ওকে কল দে একটা। আমি কি আসব তোদের সাথে?"
ফরহাদ মুহূর্ত কয়েক কিছুক্ষণ ভেবে বলে," তোর বউ স্কুলে যাবে। অর্ষা তো রান্না করতে পারলো না। মা ও হয়তো রান্না করবে না। তুই তোর বউয়ের জন্য রান্না কর।"
ফজলুল অসহায় ভঙ্গিতে ভাইয়ের দিকে তাকায়। বলে," ভাই প্লিজ, ওদের ঝামেলায় আমাকে জড়াস না। "
ফরহাদ ছোটো করে বলে," বাইক বের করে নিয়ে আয়।"
ভাইয়ের কথামতো তাদের পিছনে যেতে থাকলে ফজলুলের বউ শায়েলা বলে ওঠে," তুমি ওদের সাথে গেলে আমাকে স্কুলে কে রেখে আসবে?"
পিছনে ফিরে ফজলুল শায়েলাকে উদ্দেশ্য করে বলে," একদিন গাড়িতে গেলে কিচ্ছু হবে না শায়েলা। আমার ওয়ালেটে টাকা আছে নিয়ে চলে যেও।"
ফজলুল তার ভাইয়ের পিছু পিছু রওয়ানা দেয়। অর্ষার চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
____
জাহানারা বেগম রান্নাঘরে রান্না করছেন আর বিলাপ করছেন। বাড়ির বড়ো কর্তা আফজাল সাহেব বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি ফজরের নামাজ মসজিদে পড়ে চায়ের স্টলে সময় কাটিয়ে নাশতার সময়ে বাড়ি ফিরে আসেন৷
রান্নাঘরে স্ত্রীকে রান্না করতে দেখে সেদিকে এগিয়ে যান। আশেপাশে তাকিয়ে বলে," কী ব্যাপার ফরহাদের মা? তুমি রান্নাঘরে কেন?"
স্বামীর গলা শুনে হুহু করে কেঁদে ওঠেন জাহানারা বেগম। স্বামীর দুই বাহু ধরে বুকে মুখ গুজে বলেন," ওগো, ওই পো*ড়ামুখী আমাদের দাদা-দাদী হওয়ার সুখ কপালে আসতে দিল না গো।"
আফজাল সাহেব ভ্রুযুগল সংকুচিত করে বলেন," কী বলছ? বউমা কোথায়? আর তুমি রান্নাঘরে কেন? ছোটোবউমা একটু আজ রান্নাঘরে রান্না দেখতে পারলো না?"
" হাসপাতালে নিয়ে গেছে ফরহাদ আর ফজলুল মিলে। ছোটোবউমার নাকি খাতা দেখা বাকি।"
" তুমি চুলা বন্ধ করো। যাও ঘরে যাও। তোমার কেন রান্না করতে হবে? সে স্কুলে যাবে আর বাড়ির মানুষের রান্না করে দিতে হবে নাকি? যার আলাদা সংসার সে রান্না করে না? সংসার চালায় না?"
আফজাল সাহেব ছোটো ছেলের ঘরের দিকে যেতে থাকেন। দরজার সামনে এসে আয়নায় স্পষ্ট দেখতে পান শায়েলা বসে বসে কিছু খাচ্ছে আর ফোন টিপছে।
আফজাল সাহেব যেন রাগ দমন করতে পারেন না। হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠেন," ছোটো বউমা! তোমার শাশুড়ি অসুস্থ। তুমি বুড়ো মানুষকে রান্নাঘরে রেখে ঘরে কী করছ? যাও রান্নাটা শেষ করো। "
আফজাল সাহেবের গলা পেয়ে শায়েলা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে চলে যায়। আফজাল সাহেব নিজের ঘরে এসে বালিশের কাছে থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে ফজলুলকে ফোন করেন৷ তিনি জানেন এ সময়ে ফরহাদ ফোন ধরতে পারবে না।
রিং হওয়ার সাথে সাথে ফজলুল কল রিসিভ করে। ওপাশ থেকে নিজেই বলে ওঠে," আব্বা, ভাবির অবস্থা ভালো না। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানি না ভাগ্যে কী আছে।"
চলবে

0 Comments